প্রকাশিত: ৬:৪৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২৬
এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে একসময়ের কর্মচঞ্চল শিল্পপ্রতিষ্ঠান জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ৫৪ দশমিক ৯৯ একর জমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন এ জমিতে বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি (বিওএফ) সম্প্রসারণ করা হবে। এর মধ্য দিয়ে হাজারো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকা জলিল টেক্সটাইলের দীর্ঘ ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটল। একই সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শুরু হলো নতুন একটি অধ্যায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার জলিল টেক্সটাইল মিলসের মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জমি হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লে. জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক। বিটিএমসির পক্ষে চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে ইস্টার্ন সার্কেলের মিলিটারি এস্টেট অফিসার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠানে বিটিএমসি চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম জাহিদ হাসান, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বক্তব্য দেন।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিরক্ষা সামগ্রীসহ দেশে উৎপাদিত সব ধরনের পণ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাদৃত করতে চায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ও সেনাবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা শিল্পসহ সশস্ত্র বাহিনী কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন সম্ভাবনাঃ
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের একমাত্র অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি সম্প্রসারণ করা হলে দেশে আধুনিক সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরো সুসংহত করার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
জলিল টেক্সটাইলের জমি বিওএফের সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হলে সমরাস্ত্র উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যেভাবে শুরু হয় জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াঃ
বিওএফ সম্প্রসারণের জন্য জলিল টেক্সটাইলের জমি ব্যবহারের উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৪ সালে। ওই বছরের জুনে সেনাবাহিনী প্রধান একটি বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে মিলটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের পর জায়গাটিকে বিওএফ সম্প্রসারণের জন্য কৌশলগতভাবে উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এরপর ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর সেনাসদরের কিউএমজি শাখা থেকে মিলটি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সরকারের পটপরিবর্তনের পর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে সংশোধিত প্রস্তাব দেয়া হয়।
চলতি বছরের ১ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে জলিল টেক্সটাইলের ৫৪ দশমিক ৯৯ একর জমি প্রতীকী মূল্যে বিওএফের কাছে হস্তান্তরের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়।
শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে ক্ষোভঃ
জমি হস্তান্তরের এই উদ্যোগে অসন্তোষ রয়েছে জলিল টেক্সটাইলের সাবেক শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে। ২০০৪ সালে মিলটি পরিত্যক্ত ঘোষণার পর থেকে ১ হাজার ৭৩ জন শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা তাদের বকেয়া পাওনার অপেক্ষায় রয়েছেন।
জলিল টেক্সটাইল মিলস শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্ম শফিক বসাক অ্যান্ড কোংয়ের অডিট অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতন, গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ড বাবদ মোট ২০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।
জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড সিবিএ সভাপতি মসিউদ্দৌলা বলেন, ‘আমাদের পাওনা টাকা এখনো বুঝে পাইনি। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিটিএমসির সঙ্গে বৈঠক ও যোগাযোগ করেছি। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু পাওনা টাকার কোনো সমাধান না করেই কারখানাটি হস্তান্তর করা হচ্ছে।’
তিনি জানান, পাওনা আদায়ের দাবিতে অতীতেও তারা কর্মসূচি পালন করেছেন। হস্তান্তর অনুষ্ঠান ঘিরেও তারা কর্মসূচি পালন করবেন এবং মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করবেন।
ছিল সোনালি অতীতঃ
জলিল টেক্সটাইল শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি চট্টগ্রামের শিল্প ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পাকিস্তান আমলে ব্যক্তি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত মিলটি ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে জাতীয়করণ করে বিটিএমসির অধীনে নেয়া হয়।
মিলটিতে ছিল ১২ হাজার ৪০০ স্পিন্ডলের আধুনিক স্পিনিং ইউনিট। জাতীয়করণের পর উৎপাদন বাড়াতে উইভিং ও ডাইং বিভাগও চালু করা হয়। মানসম্মত সুতা ও কাপড় উৎপাদনের কারণে একসময় দেশীয় বাজারে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক সুনাম ছিল। প্রতিষ্ঠানটি তিনবার জাতীয় স্বর্ণপদকও অর্জন করে।
একসময় হাজারো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকা লাভজনক এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী সময়ে লোকসান ও অব্যবস্থাপনার কারণে ২০০৪ সালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে মিলটি।
পুরনো অধ্যায়ের সমাপ্তি, নতুন ইতিহাসের সূচনাঃ
একসময় যে প্রাঙ্গণে হাজারো শ্রমিকের ঘাম ও শ্রমে উৎপাদিত হতো সুতা ও কাপড়, সেই জলিল টেক্সটাইলের ৫৪.৯৯ একর জমি এখন দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে।
ফলে জলিল টেক্সটাইলের শ্রমনির্ভর শিল্পযুগের একটি অধ্যায়ের পর্দা নামলেও একই ভূমিতে শুরু হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন অধ্যায়। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বিওএফ সম্প্রসারণের মাধ্যমে আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন বাড়বে, কমবে বিদেশ নির্ভরতা এবং শক্তিশালী হবে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত।
তবে নতুন এই যাত্রার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পাওনার অপেক্ষায় থাকা সাবেক শ্রমিক-কর্মচারীদের দাবিরও একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে—এ প্রত্যাশাও রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
অনুষ্ঠানে কমান্ড্যান্ট, বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি; ভারপ্রাপ্ত জিওসি, আর্টডক ও কমান্ড্যান্ট, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি; কমান্ড্যান্ট, ইবিআরসি; জেনারেল অফিসার কমান্ডিং, ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও এরিয়া কমান্ডার, চট্টগ্রাম এরিয়া; প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব; চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার; চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি; সিডিএ চেয়ারম্যানসহ সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাহী সম্পাদক ও প্রকাশক – তৌফিকুল আম্বিয়া টিপু
বার্তা সম্পাদক- হুমায়ূন কবীর ফরীদি
বাংলাদেশ কার্যালয়- কলকলিয়া বাজার, জগন্নাথপুর, সুনামগন্জ।
প্রধান কার্যালয়- ৮২৪ মেইন স্রীট, মেনচেষ্টার, কানেকটিকাট- ০৬০৪০, যুক্তরাষ্ট্র।
ফোনঃ ০১৭১৭৯৩১৬৫৮(বিডি) +১৮৬০৭৯৬৭৮৮৮(ইউএসএ)
ইমেইলঃ usbanglabarta@gmail.com
Design and Developed by Web Nest