প্রকাশিত: ১:৫৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০২৫
যুক্তরাজ্য থেকে জামান কায়েছঃ-
সিলেট হলো হজরত শাহজালাল (রহ.), শাহপরান (রহ.) সহ তিনশ’ষাট আউলিয়ার পুণ্যভূমি এবং সাদা পাথর, হাওর, শিমুল বাগান আর চা বাগানের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এখানকার মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি খুব প্রবল। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে তাঁরা সর্বদা দান-সদকা, জাকাত, ফিতরা, কোরবানিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কাজ করে থাকেন। সম্পদশালীরা পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সবসময় সচেষ্ট। তাঁরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য পাকা ঘর তৈরি করে দেন, নলকূপ স্থাপন করেন। সামর্থ্যবানরা সামর্থ্যহীনদের প্রতিষ্ঠিত হতে বা বিদেশে যেতেও সহযোগিতা করেন।
বাংলাদেশের মধ্যে সিলেট একটি প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ সিলেটের প্রবাসীরা পাঠান, যা যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রের কোষাগারের পাশাপাশি এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রেখে আসছে। বৃহত্তর সিলেটের প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই ইচ্ছা থাকে কাউকে না কাউকে বিদেশে পাঠানোর। পছন্দের তালিকায় প্রথমেই থাকে ইউরোপ-আমেরিকা, তারপর মধ্যপ্রাচ্য। তাদের ধারণা, দেশে আয়-রোজগার নেই, অথবা যা আছে তা পর্যাপ্ত, নিরাপদ বা স্থিতিশীল নয়।
আরেকটি বড় ভয় তাদের মধ্যে কাজ করে—তা হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতি, যা বেশিরভাগ মানুষ অনিরাপদ মনে করেন। মৌলিক অধিকারগুলো এখানে অবহেলিত, যা মানুষের কথাবার্তায় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। অবশ্য এসব কারণকে অনেকাংশেই সত্য ও যুক্তিযুক্ত বলে মনে করা যায়।
এবার আসি মূল কথায়। যেহেতু বিদেশের প্রতি এখানকার মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে, তাই একটি পরিবার থেকে যখন দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানো হয়, তাঁর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে দেশে থাকা পুরো পরিবার। দেশে অবস্থানরত অন্য সদস্যরা কর্মক্ষম হলেও তাঁদের মধ্যে আর কাজকর্ম বা ব্যবসা-বাণিজ্য করে আয়-রোজগারের কোনো উৎসাহ দেখা যায় না। অবশ্য এর পেছনে কিছু খোঁড়া যুক্তিও রয়েছে। যিনি বিদেশে যান, তিনি ধরেই নেন, ‘আমাকে সবার দায়িত্ব পালন করতে হবে—এটাই আমার মূল দায়িত্ব, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য।’ এখানে বিদেশে অবস্থানরত লোকটি স্বেচ্ছায় সবার সম্পূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন এবং দেশে অবস্থানরত সকলেই সানন্দে এই দায়িত্বটুকু প্রবাসীর কাঁধে তুলে দেন।
অথচ যিনি বিদেশে গিয়েছেন, (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে) তাঁকে তাঁর মতো আয়-রোজগার করে কিছু টাকা জমিয়ে দেশে এসে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা উচিত ছিল। আর দেশে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা যে যার মতো আয়-রোজগার করে নিজের দায়িত্ব নিজে পালন করলে এতগুলো লোককে বিদেশে থেকে অমানবিক পরিশ্রম করে জীবনের বড় একটি অংশ নিজের দেশ থেকে দূরে অযত্নে-অবহেলায় কাটাতে হতো না।
তবে এখানে মূল সমস্যা যা হয়, তা হলো আমার লেখার শিরোনাম—”এই কাজ করলে লোকে কী বলবে”। এটা সিলেটের বেশিরভাগ যুবকের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। এখানকার মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত—এই সব পরিবারের এমন কোনো ছেলেকে পাওয়া যাবে না যে সে রেস্টুরেন্টে কাজ করে, ভাড়ায় গাড়ি চালায় অথবা ছোটখাটো দোকান দিয়ে বসেছে। অথচ বিদেশে গিয়ে বেশিরভাগ লোক এইসব পেশায় নিয়োজিত। কিন্তু দেশে এই কাজ করলে ইজ্জত নষ্ট হয়ে যায়। লোকলজ্জায় সমাজে মুখ দেখানোর উপযুক্ত থাকে না, নানাভাবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়। তাই বিদেশে অবস্থানরত দায়িত্বশীল ব্যক্তি যিনি, তিনি নিজে বিদেশে এই ধরনের কাজ করলেও দেশে অবস্থানরত কাউকে এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে বলেন, বরং বলতে বাধ্য হন।
প্রসঙ্গক্রমে বলি, আমার এক আত্মীয়ের সাথে কিছুদিন আগে কথা হলো। তিনি বললেন, “যদি একটি বাক্স নিয়ে স্থানীয় বাজারে ফ্লেক্সি লোডের দোকান দিয়ে বসতে পারতাম, তাহলে অনায়াসে আমার পরিবার চলত, কিন্তু এটা তো সম্ভব না, মান-ইজ্জতের বিষয়।” আরেকজনের সাথে কথা হলো, সে বলল, “নিজের গাড়ি নিজে ভাড়ায় চালাতে পারলে পরিবারের খরচের জন্য আর চিন্তা করতে হতো না, কিন্তু কী করব, এসব করলে লোকে কী বলবে।”
এখানে মাত্র দুটি উদাহরণ দিলাম, এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে আমার কাছে, যা অত্যন্ত হাস্যকর এবং বাস্তবতাবিবর্জিত। যদিও তাদের কাছে এসব বাস্তবতা। আমি বাস্তবতাবিবর্জিত বলছি এই কারণে যে, একজন সুস্থ সবল মানুষ অন্যের উপর দায়িত্ব দিয়ে নিজেকে সামাজিকভাবে উৎকৃষ্ট বা প্রতিষ্ঠিত মনে করার কোনো যুক্তি আমি দেখি না।
মানুষ ছোট থেকে বড় হয় তার মেধা, যোগ্যতা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে। এখানে লজ্জার কিছু নেই। প্রয়োজন হলে ছোট কাজ দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে এগিয়ে যান। জগতের কোনো কাজকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই, সব কাজকে সম্মান করা উচিত। আপনি যখন একটি কাজ শুরু করবেন, আপনার কর্ম-প্রতিভা ও যোগ্যতা একসময় আপনাকে আপনার যোগ্য আসনে অধিষ্ঠিত করবেই, যদি সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে পারেন অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন। শূন্য থেকে শুরু করে কোটিপতি হয়েছেন—এমন অসংখ্য উদাহরণ বাংলাদেশে রয়েছে।
অবশেষে বলব, আপনার মান-মর্যাদা ও আত্মসম্মান এসব সৎ উপার্জন এবং দায়িত্বশীল আচরণের উপর নির্ভর করে, কোনো কাজকে ছোট-বড় করে দেখার মধ্যে নয়। তাই নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখুন, আত্মমর্যাদা নিয়ে প্রতিষ্ঠার শিখরে আরোহণ করুন। আপন আলোয় আলোকিত করুন নিজেকে, সমাজকে এবং দেশকে।
লেখক -© জামান কায়েছ । ০২.১০.২০২৫ ইং,বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য ।
নির্বাহী সম্পাদক ও প্রকাশক – তৌফিকুল আম্বিয়া টিপু
বার্তা সম্পাদক- হুমায়ূন কবীর ফরীদি
বাংলাদেশ কার্যালয়- কলকলিয়া বাজার, জগন্নাথপুর, সুনামগন্জ।
প্রধান কার্যালয়- ৮২৪ মেইন স্রীট, মেনচেষ্টার, কানেকটিকাট- ০৬০৪০, যুক্তরাষ্ট্র।
ফোনঃ ০১৭১৭৯৩১৬৫৮(বিডি) +১৮৬০৭৯৬৭৮৮৮(ইউএসএ)
ইমেইলঃ usbanglabarta@gmail.com
Design and Developed by Web Nest