আজ ২৭ অক্টোবর ইসরাইলের নির্বাচনঃ পরাজয়ের মুখে নেতানিয়াহু

প্রকাশিত: ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২৬

আজ ২৭ অক্টোবর ইসরাইলের নির্বাচনঃ পরাজয়ের মুখে নেতানিয়াহু

 

ইউএস বি ডেস্কঃ

আজ মঙ্গলবারের এই তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পার্লামেন্ট নির্বাচনের দিকে নজর রাখছে পুরো বিশ্ব, যা ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটাতে পারে কিংবা দেশকে আবারো এক রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। কারণ কোনো বড় জোটেরই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পাওয়ার নিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানসহ লেবানন ও ইরানের সাথে সামরিক সংঘাতের পর ইসরাইলে এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
তাছাড়া, একাধিক সরকারের মেয়াদ শেষ করার আগেই পতনের কয়েক দশক পর ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী ইসরাইলের কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
নির্বাচনে প্রায় ৭৩ লাখ (৭.৩ মিলিয়ন) ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগের যোগ্য, যার মধ্যে প্রায় ১২ লাখ (১.২ মিলিয়ন) ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিক।
সারা ইসরাইলের প্রায় ১৮,০০০ ব্যালট বক্সসহ মোট ১২,০১৮টি পোলিং স্টেশনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্র সকাল ৭টায় (০৫:০০ জিএমটি) খুলবে এবং রাত ১০টায় (২০:০০ জিএমটি) বন্ধ হবে। নির্বাচনের দিন সেখানে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
১২০ সদস্যের নেসেটে (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) আসন জয়ের জন্য ৩৭টি দল ও নির্বাচনী তালিকা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যেখানে একটি ক্ষমতাসীন জোট গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থনের প্রয়োজন।
ইসরাইলের সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার আওতায় ভোটাররা ব্যক্তিগত প্রার্থীর পরিবর্তে দলকে ভোট দেন। পার্লামেন্টে প্রবেশ করতে হলে দলগুলোকে প্রদত্ত বৈধ ভোটের অন্তত ৩.২৫ শতাংশ পেতে হয়।
কোনো দলই কখনোই কেসেটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা নির্ধারণে জোট সংক্রান্ত সমঝোতাই চূড়ান্ত ভূমিকা রাখে।
চূড়ান্ত জরিপে এগিয়ে আইজেনকোটের দল
ইসরাইলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন নেটওয়ার্কের প্রকাশিত চূড়ান্ত সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের মধ্যপন্থী ‘য়াশার’ পার্টি নেতানিয়াহুর ‘লিকুদ’ পার্টির চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছে।
প্রাক্কলন অনুযায়ী, য়াশার পার্টি ২২ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে, যেখানে লিকুদের ঝুলিতে যেতে পারে ১৯ থেকে ২১টি আসন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং ইয়াইর লাপিদের নেতৃত্বাধীন ‘বিয়াহাদ’ (একসাথে) জোট ১৪ বা ১৫টি আসন পেয়ে তৃতীয় স্থানে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যান্য বিরোধী দলের মধ্যে রয়েছে সাবেক জেনারেল ইয়াইর গোলানের নেতৃত্বাধীন ‘ডেমোক্র্যাটস’ এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগডোর লিবারম্যানের ‘ইসরাইল বেইতেনু’।
তিনটি সমীক্ষাতেই অনুমান করা হয়েছে যে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় জোট ৫০টি আসন পাবে, অন্যদিকে বিরোধী জোট ৫২ থেকে ৫৬টি আসন নিশ্চিত করতে পারে।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলো যৌথভাবে ১৪ থেকে ১৬টি আসন জিততে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিসংখ্যান নির্দেশ করে যে, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু বা আইজেনকোট কারো পথই পরিষ্কার নয়।
সবচেয়ে বেশি আসন জিতলেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেউ প্রধানমন্ত্রী হবেন তা নয়। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ নির্বাচিত দলগুলোর সাথে পরামর্শ করে যে আইনপ্রণেতাকে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সবচেয়ে সম্ভাব্য বলে মনে করবেন, তাকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন।
তিনটি ভিন্ন মেয়াদে ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার পর ৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু আবারো জয়ের জন্য লড়ছেন।রাজনৈতিক খবর
তার প্রচারণায় জাতীয় নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যেখানে আঞ্চলিক হুমকি মোকাবেলায় তার অভিজ্ঞতা ও সামরিক নীতিকে অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ৭ অক্টোবরের হামলা রোধে ব্যর্থতা, সংঘাত ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তার এই বড় ব্যর্থতার তদন্তে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনে বিরোধিতার কারণে তার সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছে।
নেতানিয়াহু দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের মামলায়ও অভিযুক্ত, যা তিনি অস্বীকার করে আসছেন। এছাড়া গাজায় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কর্তৃক তার বিরুদ্ধে একটি গ্রেপ্তারী পরোয়ানাও জারি রয়েছে।
তার সম্ভাব্য জোট সঙ্গীদের মধ্যে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ-এর নেতৃত্বাধীন সুদূর-ডানপন্থী দলগুলো, পাশাপাশি অতি-অর্থোডক্স ‘শাস’ এবং ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ পার্টি।
বেন-গভির এবং স্মোটরিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনের সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা এবং ফিলিস্তিনিদের গাজা ত্যাগে উৎসাহিত করার পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন।
এদিকে বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাতের পর ইসরাইলি বাহিনী কর্মী সংকটে ভুগতে থাকায় অতি-অর্থোডক্স ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি বহাল রাখার দাবির মুখে চরম সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে।
আইজেনকোটের নেতৃত্বের পরিবর্তন, কিন্তু নিরাপত্তা ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান
৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরাইলি সামরিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ৭ অক্টোবরের হামলার পর গঠিত নেতানিয়াহুর জরুরি সরকারে যোগ দিয়েছিলেন।
পরে গাজা অভিযানের বিষয়ে নেতানিয়াহুর ব্যবস্থাপনা ও স্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশলের অভাবের তীব্র সমালোচনা করে তিনি সরকার ত্যাগ করেন। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করার সময় তার ছেলেও নিহত হন।
আইজেনকোট সরকারের জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন।
তিনি ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন এবং অতি-অর্থোডক্স পুরুষদের জন্য ব্যাপক সামরিক-সেবা সুবিধা বাতিলের সমর্থন করেন।
নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করলেও বেশ কয়েকটি প্রধান নিরাপত্তা ইস্যুতে আইজেনকোটের অবস্থান প্রায় একই রকম।
তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা করেন এবং বলেন যে গাজায় হামাসের সামরিক সক্ষমতা ও শাসন পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে হবে।
অতএব, দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নীতিগুলোতে একই মনোভাব পোষণ করা সত্ত্বেও এই নির্বাচন মূলত ভোটারদের সামনে শাসনব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং চরম ডানপন্থী দলগুলোর সাথে সম্পর্কের বিষয়ে আলাদা দৃষ্টিকোণ বেছে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
যদি কোনো বড় জোটই ৬১টি আসনে পৌঁছাতে না পারে, তবে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দুটি দল ‘জয়েন্ট লিস্ট’ এবং ‘রাম’ সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, জয়েন্ট লিস্ট প্রায় ৯টি আসন এবং রাম ৫ থেকে ৭টি আসন পেতে পারে।
আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকারের হয়তো সরাসরি জোটে অন্তর্ভুক্ত করে অথবা পার্লামেন্টে বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে এই ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর একটি বা উভয়েরই সমর্থনের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে এমন এক সমঝোতা বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে পারে।রাজনৈতিক খবর
লিবারম্যান আগেই ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন, আবার অন্যান্য বিরোধী নেতাও এই জাতীয় চুক্তিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে দ্বিধা বোধ করছেন।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু ডানপন্থী ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে টানতে বারবার প্রচার করছেন যে ফিলিস্তিনি দলগুলো পরবর্তী সরকার গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্ভাব্য জোট ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা
মঙ্গলবারের এই ভোট থেকে কয়েকটি সম্ভাব্য ফলাফল বেরিয়ে আসতে পারে :
নেতানিয়াহু আরেকটি সরকার গঠন করতে পারেন যদি তার জোট প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত আসন পায় বা বিদ্যমান জোটের বাইরে থেকে আইনপ্রণেতাদের আকর্ষণ করতে পারে।
আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন একটি জোট ফিলিস্তিনি দলগুলোর চুক্তি, অন্যান্য শিবির থেকে দলছুট সদস্য বা আদর্শিকভাবে বিভক্ত বিরোধী নেতাদের মধ্যকার কঠিন সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে পারে।
লিকুদ এবং প্রধান বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে একটি ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ গঠনও আরেকটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে, যদিও আইজেনকোট এবং তাঁর বেশ কয়েকজন সহযোগী নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করার বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।
কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে নেতানিয়াহু দীর্ঘায়িত আলোচনা চলাকালীন সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে যেতে পারেন, যা পরবর্তীতে দেশটিকে আরেকটি নির্বাচনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।সরকারি আদেশ দেখুন
এখানে ৩.২৫ শতাংশ নির্বাচনী থ্রেশহোল্ডের কাছাকাছি থাকা ছোট দলগুলোর পারফরম্যান্স চূড়ান্ত বলে প্রমাণিত হতে পারে। যেসব দল থ্রেশহোল্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হবে তারা কোনো আসন পাবে না, যা তাদের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বল করতে পারে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী জোটগুলোর মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই এক্সিট পোল পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক অফিসিয়াল ফলাফল রাত থেকেই বের হতে শুরু করবে, তবে সামরিক কর্মী, হাসপাতাল, কারাগার এবং অন্যান্য বিশেষ ভোটিং ব্যবস্থার ব্যালট গণনায় কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে।রাজনৈতিক খবর
আগামী ৪ নভেম্বরের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশের কথা রয়েছে, যার পর জোট গঠনের মূল দরকষাকষি কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে।
সূত্র : আনাদুলু নিউজ

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ