স্কুল ফাঁকি দিয়ে পার্কে বিনোদন—বিপদের আগেই তিন কিশোরীকে ফেরালেন চন্দনাইশের ইউএনও

প্রকাশিত: ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬

স্কুল ফাঁকি দিয়ে পার্কে বিনোদন—বিপদের আগেই তিন কিশোরীকে ফেরালেন চন্দনাইশের ইউএনও

 

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ

বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে স্কুলের পোশাক পরে বের হয়েছিল তিন বান্ধবী। গন্তব্য বিদ্যালয় নয়, ছিল একটি পার্ক। সঙ্গে ছিল বাড়তি পোশাক ও দুপুরের খাবারও। তবে তাদের সেই পরিকল্পনা সফল হতে দেননি চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুর রহমান। পথিমধ্যে সন্দেহ হওয়ায় গাড়ি থামিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলে পার্কে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। পরে অভিভাবক ও শিক্ষকদের ডেকে তিন শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে দেন।
ইউএনওর এমন তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবেও সামনে এসেছে।
ঘটনাটি ঘটে ৩ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চনাবাদ এলাকায়।
জানা যায়, সাম্প্রতিক বন্যায় আশ্রয়ণের ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন শেষে উপজেলা সদরে ফিরছিলেন ইউএনও মো. আবদুর রহমান। পথে স্কুলের পোশাক পরা তিন কিশোরীকে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার সন্দেহ হয়। তিনি গাড়ি থামিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। একপর্যায়ে তিন শিক্ষার্থী স্বীকার করে, বিদ্যালয়ে না গিয়ে তারা স্থানীয় একটি পার্কে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
পরে স্থানীয় মহিলা ইউপি সদস্যের সহযোগিতায় তাদের কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে নেওয়া হয়। খবর দেওয়া হয় তিন শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। সবার উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার মুচলেকা নেওয়া হয়। এরপর অভিভাবক ও শিক্ষকদের কাছে তাদের বুঝিয়ে দিয়ে বিদ্যালয়ে ফেরত পাঠানো হয়।
১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরীদের কাছে বন্ধুদের সঙ্গে পার্কে ঘুরতে যাওয়া হয়তো নিছক বিনোদনের বিষয়। কিন্তু বিদ্যালয় ফাঁকি দিয়ে অভিভাবকের অজান্তে কোথাও যাওয়া তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নির্জন বা অপরিচিত স্থানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের একা যাতায়াত তাদের নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে পারে।
একটি ছোট ভুল সিদ্ধান্ত কখনো কখনো বড় দুর্ঘটনা, নিখোঁজ হওয়া, প্রতারণা কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই কিশোর-কিশোরীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা, চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়েও অভিভাবকদের সচেতন নজর রাখা জরুরি।
চন্দনাইশ ইউএনও মো. আবদুর রহমান বলেন, বিদ্যালয় ফাঁকি দিয়ে পার্কে ঘুরতে যাওয়াকে ওই শিক্ষার্থীরা কোনো অপরাধ মনে করেনি। কিন্তু ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী এসব শিক্ষার্থী নির্জন কোনো পার্কে গেলে সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকতেই পারে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিনি অভিভাবক ও শিক্ষকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
স্থানীয় অভিভাবকদের মতে, তিন শিক্ষার্থীকে শাস্তি না দিয়ে বুঝিয়ে বিদ্যালয়ে ফেরত পাঠানোর ঘটনাটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি বুঝতে পারবে, তেমনি অভিভাবকরাও সন্তানের দৈনন্দিন চলাফেরা ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতির বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হবেন।
শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; বিদ্যালয়, শিক্ষক, প্রশাসন ও সমাজের প্রত্যেকের সম্মিলিত দায়িত্ব। চন্দনাইশের এই ঘটনা তাই কেবল তিন শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা নয়—এটি সন্তানদের প্রতি আরও যত্নশীল ও সচেতন হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ