গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে চট্টগ্রাবাসী, প্রয়োজনের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহ

প্রকাশিত: ৪:৩২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২৬

গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে চট্টগ্রাবাসী, প্রয়োজনের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহ

 

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ

চট্টগ্রামে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিকে তীব্র সংকট; ১১ আগস্টের আগে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদায় গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে ২২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে।

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ কম গ্যাস পাচ্ছে বন্দরনগরী। ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ, সার কারখানা, সিএনজি স্টেশন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক খাত—সবখানেই তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রামের বাসা-বাড়ির চুলায় গ্যাস থাকছেনা অধিকাংশ সময়, ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক সপ্তাহ আগে মহেশখালীর এঙিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লারে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের চেষ্টা চালালেও এখনো পুরোপুরি সফল হননি। বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আনা হচ্ছে। একটি বয়লার চালু করা গেলে আগামী ১ আগস্টের পর দৈনিক প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধারের আশা করা হচ্ছে। তবে পুরো টার্মিনাল সচল হতে ১১ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দেশের বর্তমান দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর বড় প্রভাব পড়েছে সম্পূর্ণ এলএনজিনির্ভর চট্টগ্রামে।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত। রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) বন্ধ রয়েছে। কেবল কাফকোতে সীমিত পরিসরে সার উৎপাদন চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে গেছে। বর্তমানে শুধু শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে সীমিত আকারে উৎপাদন চালানো হচ্ছে। এর প্রভাবে চট্টগ্রামে লোডশেডিংও বেড়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ও সার খাতে গ্যাস বরাদ্দ দেওয়ার পর অবশিষ্ট প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে শিল্প, বাণিজ্যিক, আবাসিক ও সিএনজি খাতের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এতে পুরো নেটওয়ার্কে প্রয়োজনীয় চাপ ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় রান্নার চুলায় গ্যাস থাকছে না।
সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস নিতে পারছেন না। সংকটকে পুঁজি করে কিছু সিএনজিচালিত ট্যাক্সিচালক অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে স্টিল, রি-রোলিং, কাচ, সিরামিক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাভাবিক সময়েও চট্টগ্রামের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। দীর্ঘদিন ধরে দৈনিক ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও সংকট শুরুর আগে তা নেমে আসে ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুটে। বর্তমানে সরবরাহ আরও কমিয়ে ২২৫ থেকে ২৩0 মিলিয়ন ঘনফুটে নামানো হয়েছে।
কেজিডিসিএলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। জাতীয় চাহিদার কারণে অন্য অঞ্চলে সরবরাহ বাড়াতে হলে চট্টগ্রামে আরও কাটছাঁটের প্রয়োজন হতে পারে।
এদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বিষয়ে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া এলএনজি সরবরাহ, কারিগরি সহযোগিতা কিংবা প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তাদের আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ