দিরাইয়ে দুই বার উদ্বোধনের পরও ১১ বছর তালাবদ্ধ হাসপাতাল

প্রকাশিত: ৫:৪৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২৬

দিরাইয়ে দুই বার উদ্বোধনের পরও ১১ বছর তালাবদ্ধ হাসপাতাল

মোঃ আশরাফ উদ্দিন,  দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
উদ্বোধনের দিন থাকে উৎসবমুখর পরিবেশ, মন্ত্রী-এমপিদের হাত ধরে ফিতা কাটা হয়। কিন্তু উৎসবের আলো নিভতেই হাসপাতালটি রূপ নেয় এক ভুতুড়ে বাড়িতে। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার জগদল ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের গল্পটা ঠিক এমনই এক আমলাতান্ত্রিক প্রহসনের। প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই হাসপাতালটি দুই দফায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদ্বোধন করা হলেও দীর্ঘ ১১ বছর ধরে এর মূল ইনডোর বা অন্তরবিভাগ কার্যক্রম পুরোপুরি তালাবদ্ধ। চিকিৎসক, নার্স ও জনবলের চরম সংকটে ভেতরের কোটি টাকার সরকারি চিকিৎসা সরঞ্জাম এখন ধুলো আর মরিচায় নষ্ট হচ্ছে। ফলে দিরাই, জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ছয়টি দুর্গম ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ যুগ যুগ ধরে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।
​সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে এক হাহাকার চিত্র। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ইনডোর ইউনিটের প্রতিটি কক্ষ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। হাসপাতালের ওয়ার্ডের মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মৃত চড়ুই পাখির দেহাবশেষ। রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত দামি স্টিলের বেড ও মেট্রেসগুলো একটি কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে, যেগুলোতে ইতিমধ্যে মরিচা ধরে নষ্ট হতে চলেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্টোর রুমে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে সরকারি বরাদ্দের বিপুল পরিমাণ কাপড়ের গজ, ব্যান্ডেজ, সিরিঞ্জ ও তুলাসহ চিকিৎসার নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী। আর হাসপাতালের দেয়ালে লাগানো মূল্যবান এয়ার কন্ডিশনারগুলোতে খড় ও লতাপাতা দিয়ে বাসা বেঁধেছে পাখির ঝাঁক।
​উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে জগদল গ্রামে তিন একর জায়গার ওপর হাসপাতালটির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর প্রথম দফায় প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ শেষে ২০১৩ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হাসপাতালটির প্রথম দফা উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে আরও ১ কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটি সংস্কার করার পর ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দ্বিতীয় দফায় এটি উদ্বোধন করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, উদ্বোধনের দিন লোকবল দেখানো হলেও মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তদবির করে বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলি হয়ে চলে যান। ১৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১৪টি পদই দীর্ঘ ১১ বছর ধরে শূন্য। এমনকি এক্স-রে, ইসিজি বা আল্ট্রাসনোগ্রামের মতো অতি প্রয়োজনীয় ১৩টি মেডিকেল সরঞ্জামের একটিও এখানে নেই।
​হাসপাতালটির এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদগণ। জগদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন রশিদ লাভলু বলেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকার এই হাসপাতালটি বানাল, দুইবার বড় বড় মন্ত্রীরা এসে উদ্বোধনও করলেন, কিন্তু এই ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ একটা প্যারাসিটামল ওষধও এখান থেকে পায় না। সামান্য ডেলিভারি রোগী বা জরুরি চিকিৎসার জন্য এই অঞ্চলের মানুষকে মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে জেলা সদরে যেতে হয়। পথে কত রোগী যে মারা যায় তার হিসাব নেই। জনবল সংকটের অজুহাত দিয়ে একটি হাসপাতাল এভাবে এক দশকের বেশি সময় তালা মেরে রাখা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা অবিলম্বে এই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার দাবি জানাচ্ছেন।
​একই সুরে ক্ষোভ প্রকাশ করে জগদল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, একটি এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রধান শর্ত হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। এখানে বিশাল অবকাঠামো আছে, কিন্তু ভেতরে কোনো ডাক্তার নেই, সেবা নেই। এই অঞ্চলের দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের মানুষগুলো চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। হাসপাতালটি চালু থাকলে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ বাঁচত। স্বাস্থ্য বিভাগের এই চরম উদাসীনতা ও অবহেলা অত্যন্ত দুঃখজনক।
​হাসপাতালের সামগ্রিক পরিবেশ ও দাপ্তরিক জটিলতা নিয়ে দিরাই উপজেলা হাসপাতালের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আফজাল হোসেন বলেন, হাসপাতালটির মাঠপর্যায়ের স্যানিটেশন ও সামগ্রিক পরিবেশ তদারকির ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভেতরের মূল্যবান অবকাঠামো ও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। হাসপাতালটি পুরোপুরি সচল করতে এবং এখানকার পরিবেশ উন্নত রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিশেষ বরাদ্দ ও জনবল নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
​এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দেবাশীষ রায় বলেন, হাসপাতালটির ইনডোর ইউনিট চালু এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য বারবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত পত্র পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওপর মহল থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। জনবল এবং প্রয়োজনীয় মেডিকেল ইকুইপমেন্ট না পেলে মাঠপর্যায়ে ইনডোর সেবা চালু করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
​হাওড়াঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নির্মিত এই জগদল হাসপাতালটি এখন যেন কেবলই এক প্রদর্শনের বস্তু। অবহেলা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার তালা ভেঙে হাসপাতালটি কি আদেও কোনোদিন সাধারণ মানুষের উপকারে আসবে, এখন সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন দিরাই ও জগন্নাথপুরবাসী।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ